নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধের জের ধরে কক্সবাজারের প্রথম শ্রেণীর একজন ঠিকাদার ও রাজনৈতিক কর্মীকে ‘মিথ্যা’ অপহরণ মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। মোহাম্মদ শাহজাহান নামের ওই ঠিকাদারকে শুধু অপহরণ মামলা নয়, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের একটি মামলার আসামি তালিকায়ও নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও শাহজাহান দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
সুত্রমতে, পুলিশও প্রাথমিক তদন্তে অপহরণ মামলাটি সাজানো বলেই মনে করছে। যদিও তারা এখন পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

কক্সবাজার শহরে বসবাসকারি, কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের পশ্চিম পাড়ার মৃত আশকর আলীর ছেলে শাহজাহানের অভিযোগ, কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকায় এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসায়ী মৃত সৈয়দ আহমদের ছেলে মো. সেলিম রেজা ও তার পরিবারের সাথে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধ লেগে আছে। এই বিরোধকে সেলিম রেজা ব্যবসায়িক ও ঠিকাদারি কাজেও নিয়ে গেছেন।
তার অভিযোগ, কক্সবাজার শহরের কাছের ইউনিয়ন খুরুস্কুলে স্থাপিত বায়ূ বিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন তিনি। বেশ কিছুদিন আগে ওই বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সড়ক নির্মাণের জন্য মোহাম্মদ শাহজাহানের পাশাপাশি সেলিম রেজাও দরপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কাজটি না পাওয়ায় ঠিকাদার শাহজাহানের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগেন।

ঠিকাদার মোহাম্মদ শাহজাহান অভিযোগ তুলেছেন, সেলিম রেজা ওরফে গ্যাস সেলিম ঠিকাদার শাহজাহানকে ফাঁসানোর জন্য নিজের স্ত্রী কামরুন্নেছা রুমিকে বাদী করে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে (আদালত-০৩) ‘মিথ্যা’ অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ তুলে একটি মামলা করেছেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মানবপাচার ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটিতে আসামি তালিকায় কেবল ঠিকাদার মোহাম্মদ শাহজাহানের নাম দেয়া হয়েছে। যদিও ৪/৫ জন অজ্ঞাত আসামির কথাও বলা আছে।

অপরদিকে ঠিকাদার শাহজাহানের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ইউনিয়নে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঝটিকা মিছিল করার অভিযোগে ১৭ ডিসেম্বর সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) খোকন বড়ুয়া ৩৩ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ‘আওয়ামী লীগের অর্থযোগানদাতা’ উল্লেখ করে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহজাহানকে ৩০ নম্বর আসামি করা হয়। তার দাবি, শুধুমাত্র পারিবারিক বিরোধের কারণে সেলিম রেজাই এই মামলায় ঠিকাদার শাহজাহানকে আসামি করিয়েছেন।
তার দাবি, তিনি সারাজীবন বিএনপির রাজনীতি করে এসেছেন। বর্তমানেও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য। তিনি কখনো আওয়ামী লীগ কিংবা দলটির সহযোগী কোন সংগঠনকে একটি টাকাও চাঁদা দেননি। মূলতঃ সেলিম রেজাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

সুত্র বলছে, যখন বিএনপি নেতা-কর্মীরা মুক্ত স্বাধীন ভাবে রাজনীতি ও পারিবারিক জীবনযাপন করছেন, তখন পারিবারিক বিরোধের জের ধরে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহাজাহান ‘মিথ্যা’ মামলায় আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনজুর আলম বলেন, আমরা যতটুকু জেনেছি, অপহরণের ঘটনাটি সাজানো মনে হচ্ছে। শাহজাহান ছেলেটি অপরাধ করার মতো লোক না। হয়তো পারিবারিক বিরোধের কারণে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
তিনি জানান, বিষয়টি তারা পুলিশকেও জানিয়েছেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলাধীন চৌফলদন্ডি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন বলেন, বিএনপি নেতা শাহজাহান আমাদের চেনা। তিনি একজন ঠিকাদার ও সামাজিক কাজে জড়িত। তিনি অপহরণের মতো কোনো ঘটনায় জড়িত আমরা বিশ্বাস করি না।

তিনি বলেন, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে অপহরণ ও মানবপাচার মামলা করা হয়েছে।

অপহরণ মামলাটির তদন্তকারি কর্মকর্তা, কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক দূর্জয় বিশ^াস জানান, প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে ঘটনাটি সাজানো। বাদী মুক্তিপণের ঘটনাস্থল দেখিয়েছেন টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর এলাকায়। কিন্তু তারা নিজেরাই এলাকাটি চিনতে পারছেন না।

তবে তিনি জানান, আসামি ও বাদীর মোবাইলের অবস্থান যদি এক জায়গায় পাওয়া যায় তখনই বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে। এখনও মোবাইল কলের সেই তালিকা তিনি সংগ্রহ করতে পারেননি।

এ বিষয়ে অপহরণের ঘটনাটি সঠিক দাবি করে মামলার বাদী কামরুন্নেছা রুমি বলেন, শাহজাহানের নানামুখী হুমকির মুখে আমি মহিলা হয়েও আদালতে গিয়ে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি প্রশ্ন তুলেন, হুমকি ধমকি যদি ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায় তখন মামলা না করে কোন উপায় আছে?

তবে তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর স্বামী সেলিম রেজার সাথে মোহাম্মদ শাহজাহানের পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
‘মিথ্যা’ মামলার শিকার বিএনপি নেতা ও ঠিকাদার মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, অপহরণ কিংবা অপহরণ চেষ্টার মতো কোন ঘটনাই ঘটেনি। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সঠিক ভাবে তদন্ত করলেই আসল সত্যি বেরিয়ে আসবে।

তিনি মিথ্যা মামলাকারি কামরুন্নেছা রুমি ও তার স্বামী সেলিম রেজার শাস্তিও দাবি করেছেন।